পাটনা, ২৫ অক্টোবর: দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রচার করার জেরে মোকামার বিধায়ক অনন্ত সিংহ এবং তাঁর স্ত্রী, প্রাক্তন বিধায়ক নীলম দেবীকে ছ’বছরের জন্য বহিষ্কার করল জনতা দল ইউনাইটেড। শনিবার, ২৪ অক্টোবর এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে দু’জনের প্রাথমিক সদস্যপদও অবিলম্বে বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি অনন্তের বিধায়কপদ খারিজ করার জন্য বিহার বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছে জেডিইউ।

বিহার জেডিইউ সভাপতি উমেশ সিংহ কুশওয়াহার জারি করা নির্দেশে অভিযোগ, অনন্ত বারবার দলের নির্দেশ অমান্য করেছেন। শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আপত্তিকর ও অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করার পাশাপাশি বিধান পরিষদের নির্বাচনে অন্য দলের প্রার্থীর হয়ে প্রচার করেছেন তিনি। নীলমের বিরুদ্ধেও দলবিরোধী কাজে যুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। অনন্তের বিধানসভা সদস্যপদ খারিজের দাবিতে সংবিধানের দশম তফসিলের উল্লেখ করেছে দল।

বিরোধের কেন্দ্রে বিহার বিধান পরিষদের পটনা স্নাতক নির্বাচনী আসন। সেখানে বিদায়ী সদস্য নীরজ কুমারকে প্রার্থী করেছিল জেডিইউ। কিন্তু দলীয় প্রার্থীর পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে জন সুরাজের প্রার্থী অনুজ সিংহকে সমর্থন করেন অনন্ত। তাঁর হয়ে প্রচার চালানোর পাশাপাশি মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়ও সঙ্গে ছিলেন মোকামার বিধায়ক। ফলে কয়েক সপ্তাহ ধরেই দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর সংঘাত ক্রমশ তীব্র হচ্ছিল।

অনন্তের বক্তব্য, আগের বিধানসভা নির্বাচনে নীরজই তাঁর বিরুদ্ধে কাজ করেছিলেন। তখন দল কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। এখন তিনি নীরজের বিরোধিতা করায় কেন শৃঙ্খলার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, তা নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন তিনি। নীরজের নিজস্ব রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও কটাক্ষ করেন অনন্ত। তাঁর অভিযোগ, নীতীশ কুমারের নামেই নির্বাচনী সাফল্য পান নীরজ। দল ব্যবস্থা নিলে তা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকার কথাও আগেই জানিয়েছিলেন তিনি।

দুই নেতার বিরোধ অবশ্য নতুন নয়। ২০১৫ সালের মোকামা বিধানসভা নির্বাচনে নির্দল প্রার্থী হয়ে জেডিইউয়ের নীরজকে হারিয়েছিলেন অনন্ত। সেই পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবারের বিধান পরিষদ নির্বাচনে ফের সামনে আসে। নীতীশ কুমার এবং দলের কার্যনির্বাহী জাতীয় সভাপতি সঞ্জয় কুমার ঝায়ের তরফে দলীয় অবস্থান মেনে চলার বার্তা গেলেও অনন্ত নিজের সিদ্ধান্ত বদলাননি। সমঝোতার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।

নির্বাচনী প্রচারের উত্তেজনা ভোটের দিনও ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার মোকামায় অনুজ ও নীরজের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে। অনন্তের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছোটু সিংহকেও পটনায় শান্তিভঙ্গের অভিযোগে আটক করা হয়। অনন্ত দাবি করেন, তাঁর সমর্থকদের বিভিন্ন থানায় আটকে রাখা হচ্ছে। তবে জনসমর্থন অনুজের সঙ্গেই রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। অন্যদিকে এনডিএ প্রার্থী হিসেবে জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস জানান নীরজ।

মোকামায় ‘ছোটে সরকার’ নামে পরিচিত অনন্তের রাজনৈতিক জীবনে এই বহিষ্কার আরেকটি মোড়। ২০০৫ ও ২০১০ সালে জেডিইউয়ের টিকিটে জেতার পরে ২০১৫ সালে দল ছেড়ে নির্দল হিসেবে জয়ী হন তিনি। ২০২০ সালে জেতেন আরজেডির প্রার্থী হয়ে। অস্ত্র মামলায় সাজা হওয়ায় ২০২২ সালে তাঁর বিধায়কপদ খারিজ হয়। পরবর্তী উপনির্বাচনে আরজেডির টিকিটে জয়ী হন নীলম।

২০২৪ সালে পটনা হাই কোর্ট অস্ত্র মামলায় অনন্তকে খালাস করে। পরে জেডিইউয়ে ফিরে ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মোকামা থেকে আবার জয়ী হন তিনি। এবার তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থার পাশাপাশি বারহ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি ময়ঙ্ক রাজকেও সরিয়েছে জেডিইউ; ভেঙে দেওয়া হয়েছে জেলা কমিটি। বিধান পরিষদ নির্বাচনের গণনা নির্ধারিত ২৭ অক্টোবর। তার আগেই বহিষ্কারের সিদ্ধান্তে অনন্তের সঙ্গে দলের সম্পর্কের নতুন বিচ্ছেদ স্পষ্ট হল।

আপাতত নিশ্চিত হয়েছে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত। বিধায়কপদ খারিজের বিষয়টি দলের দাবি হিসেবেই রয়েছে; সদস্যপদ ইতিমধ্যে বাতিল হয়েছে—এমন ঘোষণা এই প্রতিবেদনে নেই। ফলে পরবর্তী নজর থাকবে নির্বাচনের ফল এবং অধ্যক্ষের কাছে তোলা দাবির নিষ্পত্তির দিকে।